জ্বালানি সংস্থান প্রক্রিয়া, নানা উদ্ভাবন, ভূরাজনীতি এবং এসব প্রভাবকের ওপর নির্ভরশীল দামের উত্থান-পতন বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ডামাডোল এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌর ও বায়ুশক্তির উত্থানে ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা ক্রমে কমে আসছে। একই সঙ্গে উত্তোলন বাড়ায় ২০৩০ সাল নাগাদ জীবাশ্ম জ্বালানি আগের তুলনায় সাশ্রয়ী ও সহজপ্রাপ্য হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। খবর রয়টার্স।
সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের সরকারগুলো চলতি দশকের শেষদিকে ক্লিন এনার্জিতে রূপান্তরের গতি আরো বাড়াবে। এ কারণে জীবাশ্ম জ্বালানি শিগগিরই উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা হবে এবং এর মজুদ আরো বাড়বে।
বৈশ্বিক এ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নতুন জ্বালানি যুগের’ ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে দেশগুলোর সামনে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার মজুদ থাকবে। ফলে গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক খাতে এসব জ্বালানির দাম কমবে।
প্যারিসভিত্তিক সংস্থাটির সম্প্রতি প্রকাশিত প্রভাবশালী বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভূরাজনৈতিক উত্থান-পতনে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম সম্প্রতি বেড়েছে। এ অবস্থা থেকে গ্রাহক কিছুটা ‘দম ফেলার সুযোগ’ আশা করতে পারে। কারণ নতুন নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানি বিশ্বের চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাবে।
এ বিষয়ে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল জানান, পূর্বাভাস নিশ্চিত করে ২০৩০ সালের আগে বিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানি খরচ সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠবে এবং জলবায়ু নীতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ীভাবে দাম কমবে। সামগ্রিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখলে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম আরো কমে যাবে।
তিনি বলেন, ‘ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম আবার ১০০ ডলার দেখতে পাব কিনা বলতে পারি না। তবে আমি যা বলতে পারি, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত সত্ত্বেও আমরা এখনো জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ৭০ ডলার দেখতে পাচ্ছি।’
এদিকে দুর্বল চীনা চাহিদা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে গত মঙ্গলবার জ্বালানি তেলের দাম ৭৪ ডলারের নিচে নেমে আসে।
আইইএ স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহে নিকট মেয়াদে ব্যাঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে ওই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অব্যাহত রফতানি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেখলে ‘অন্তর্নিহিত বাজারের ভারসাম্য আরো সহজ’ ও ‘ভবিষ্যতে দর কমার’ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
আইইএর পূর্বাভাস অনুসারে, এ দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫-৮০ ডলারে স্থির হতে পারে। এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) আমদানি করা গ্যাসের দাম বড় আকারে কমতে পারে। ২০২২ সালে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমবিটিইউ) ৭০ ডলারের রেকর্ড গড় উচ্চতায় উঠে আসে, যা দশকের শেষ নাগাদ ৬ ডলার ৫০ সেন্টে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইইএর তথ্যানুসারে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পরিকল্পিত গ্যাস প্রকল্প বাড়ায় দামের ওপর প্রভাব পড়বে।
এছাড়া ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে জাহাজের মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিতে বিনিয়োগ বেড়েছে। বিপরীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস আমদানি ব্যাপকভাবে কমছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের এলএনজি সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন প্রকল্প থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হতে পারে। এর আংশিক কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বৃহত্তম জ্বালানি তেল আমদানিকারক চীন দ্রুত বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুসারে, সাম্প্রতিক দশকগুলোয় জ্বালানি তেলের বাজার বৃদ্ধির প্রধান ইঞ্জিন ছিল চীন। কিন্তু সে ইঞ্জিন এখন বিদ্যুতে মনোযোগ দিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিক্রীত সব নতুন গাড়ির প্রায় ২০ শতাংশ ইভি। আইইএর পূর্বাভাস হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫০ শতাংশে। অন্যদের তুলনায় বেশ আগেই এ বছর সে লক্ষ্য অর্জন করেছে চীন। ইভি বিক্রির বাড়বাড়ন্তের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের চাহিদা কমবে।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, ‘গ্রাহকের জন্য নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে আরো স্বস্তিদায়ক হবে।’ সঙ্গে এ বলে সতর্ক করেন দেন, এ পরিবর্তনে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ও হিট পাম্পের মতো সবুজ বিকল্পে আরো কিছু প্রয়োজন হবে। কারণ ক্রমে সাশ্রয়ী হতে থাকা জীবাশ্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার জন্য এসব নতুন উদ্ভাবনকেও সস্তা হতে হবে।
পূর্বাভাস অনুসারে, ক্লিন এনার্জির উৎসগুলোর চাহিদার ঊর্ধ্বগতি আগামী বছরগুলোয় আরো বাড়বে। এ বিষয়ে দেশগুলোর বর্তমান প্রবণতা অনুসরণ করলে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী চাহিদার সঙ্গে জাপানে ব্যবহারের সমতুল্য বিদ্যুৎ যোগ হবে। সরকারগুলো নিট জিরো কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যে নতুন নীতি বাস্তবায়ন করলে এ চাহিদা আরো বাড়বে।